নাটোরে পানিতে ডুবে ১১ মাসে ২৬ শিশুর মৃত্যু!

মোট দেখেছে : 126
প্রসারিত করো ছোট করা পরবর্তীতে পড়ুন ছাপা

মোঃ কামাল মাহমুদ বাগাতিপাড়া,(নাটোর) প্রতিনিধিঃ দারিদ্র্য, অসচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবে সারা দেশে প্রতিনিয়ত পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। অথচ পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার নির্ধারণ বা পরিসংখ্যান নির্ণয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কোনো কার্যকর তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে সরকারি বা বেসরকারি কোনো দপ্তরেই এ সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান রাখা হয় না।

গত সপ্তাহে নাটোর জেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে বিশেষ অনুসন্ধান করতে গিয়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এ ব্যাপারটি নিয়ে তাদের কাছে সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই। তাই এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো তথ্য রাখার প্রয়োজন হয়নি। এটা শুধু নাটোর কেন্দ্রিক নয়, সারা দেশেই প্রায় একই চিত্র বলে দাবি করেন তারা।


এদিকে নাটোরের খাল-বিল, নদী ও পুকুর বা ডোবার পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর মত ঘটনা ঘটছে অহরহ। চলতি ২০২০ সালের গত ১১ মাসে জেলার সাতটি উপজেলায় অন্তত ২৬ জন বিভিন্ন বয়সের শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। বিশেষ করে চলনবিল ও হালতিবিল অধ্যুষিত এলাকায় এ মৃত্যুর হার বেশি। এতে ১০ বছর বয়সের চেয়ে কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই বেশি। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে আগস্ট মাসে।  আর অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বাড়ির পাশের পুকুর কিংবা ডোবা, নদী ও বিলের পানিতে পড়ে।  স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করে এসব তথ্য জানা গেছে।


অথচ জেলার সব থানা, হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, পরিসংখ্যান বিভাগ, জেলা প্রশাসনসহ কোথাও এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে কোনো কার্যকর তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কোনো দপ্তরেই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান নেই।


এ নিয়ে নানা রকম অভিমত ব্যক্ত করেছেন প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজনরা। কেউ বলছেন, মা ও অভিভাবকদের গাফিলতি এবং অসাবধানতাই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ। আবার অনেকেই বলেছেন, দারিদ্রতা, অসচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার অনেকাংশে বেড়ে যাচ্ছে।


আর খেলতে খেলতেই বাড়ির পাশের ডোবা, খাল, পুকুর ও বিলের পানিতে পড়ে মারা যায় এসব শিশুরা। শিশুর মা ও অভিভাবকগণ সচেতন থাকলে বা নজরে রাখলে এসব দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। কাজেই শিশুর মৃত্যুর হার কমাতে চাইলে প্রথমেই পরিবার এবং তার পাশের লোকজনকে সচেতন হতে হবে বলে দাবি করেছেন তারা।


অন্যদিকে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান না থাকার বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পানিতে ডুবে শিশু মারা যাওয়ার ঘটনাটি অস্বাভাবিক মৃত্যু বলে বিবেচিত হয়। যা নিকটস্থ থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা দায়ের করার কথা।  কিন্তু অভিভাবকরা শিশুদের মরদেহ কাটা ছেঁড়া বা ময়নাতদন্তের ভয়ে থানা পুলিশকে এড়িয়ে চলেন।


এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও অবহিত করা হয় না। ঘটনা ঘটার পর পরই মরদেহ দাফন করা হয়। ফলে ঘটনাটি আড়ালেই রয়ে যায়। এজন্য থানা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদসহ কোনো দপ্তরেই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি নথিযুক্ত হয় না। শুধুমাত্র বজ্রপাত বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সরকারিভাবে তথ্য রাখা হয়।  তবে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু সংখ্যা নির্ধারণে প্রশাসনের ভূমিকা রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন অনেকেই।


এ ব্যাপারে নলডাঙ্গা উপজেলার ব্রহ্মপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় কোনো শিশু মারা গেলে অভিভাবকরা মৃত্যু সনদ নিতে পরিষদে আসেন। এ সময় তাদের মৃত্যু সনদ দেওয়া হয়। তবে কি কারণে মারা গেছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য তাদের জানানো হয় না। আর পানিতে পড়ে মারা যাওয়া শিশুর মৃত্যু সংক্রান্ত আলাদা কোনো পরিসংখ্যান তাদের অফিসে রাখা হয় না। তার জানা মতে সারা দেশের কোনো ইউনিয়ন পরিষদেই এ সংক্রান্ত তথ্য নেই।


কারণ এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা তাদের কাছে নেই। অন্যান্য বিষয়ে তথ্য রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ ব্যাপারে নেই। তবে এ বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি বলে দাবি করেন তিনি।


নাটোরে শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘আলো’র নির্বাহী পরিচালক শামীমা লাইজু নীলা জানান, তারা  প্রতিনিয়ত মা ও শিশুকে নিয়ে কাজ করেন এবং শিশুদের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করেন। কিন্তু পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে কোনো তথ্য উপাত্ত তাদের কাছে নেই। তবে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বলেন, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি।


এ জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এর তথ্য ও পরিসংখ্যান সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে চাইলে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে অথবা সামাজিকভাবে এবং পারিবারিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও কাজ করতে পারে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


নাটোর ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা মো. আক্তার হামিদ বাংলানিউজকে বলেন, দুর্ঘটনাজনিত কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু ঘটলে সেগুলোর তথ্য তাদের দপ্তরে রাখতে হয়। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর তথ্য বা পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। শুধুমাত্র ডুবুরিরা যে সমস্ত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেন সেগুলোর তথ্য রাখা হয়।  বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও তাদের কাছে কোনো খবর আসে না। তাই তারা এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকাও রাখতে পারেন না।


তবে এ বিষয়ে রাজশাহী ফায়ার স্টেশনের ডুবুরি দলের কাছে এসব তথ্য থাকতে পারে।

আরো দেখুন

সাম্প্রতিক ভিডিওগুলি