তালেবানের ভয়ে ‘আত্মগোপনে’ আফগান নারী ক্রিকেটাররা

সর্বমোট পঠিত : 50 বার
জুম ইন জুম আউট পরে পড়ুন প্রিন্ট

এসেল তার আসল নাম নয়। তালেবানের আফগানিস্তানে নাম প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলাও তিনি নিরপদ মনে করছেন না। বিবিসি একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কাবুলে তালেবান সদস্যরা এরইমধ্যে নারী ক্রিকেট দলের সদস্যদের খোঁজ করতে শুরু করে দিয়েছে।

এসেল বিবিসিকে বলেন, “আমার মত যারাই ক্রিকেট বা অন্য কোনো খেলাধুলায় যুক্ত, তারা কেউ এখন আর নিরাপদ না। কাবুলের পরিস্থিতি এখন মোটেও ভালো না।”

এসেলদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। প্রতি রাতে সেখানে তারা নিজেদের সঙ্কটের গভীরতা নিয়ে আলাপ করেন। কী করা উচত, সে বিষয়ে যে যার পরিকল্পনা বলেন। কিন্তু সবাই ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছেন তারা। 

অগাস্টের মাঝামাঝি সময়ে তালেবান কাবুলের দখল নেওয়ার পর থেকে বাড়ির বাইরে খুব কমই বের হন এসেল। নিজের ক্রিকেট খেলার সরঞ্জামগুলো তিনি লুকিয়ে রেখেছেন।

এর আগে তার দলেরই একজন নারী ক্রিকেটার কীভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন, সে কথা তিনি বলেছেন বিবিসিকে। যে গ্রামে তারা ক্রিকেট খেলতেন, সেখানে তাদের পরিচিত কিছু লোক এখন তালেবানের সঙ্গে কাজ করে।

এসেল জানান, তালেবান যখন কাবুলের দখল নিল, তখন সেই লোকেরা এসে তাদের শাসিয়ে গেছে, “তোমরা যদি ক্রিকেট খেলার চেষ্টা কর, তাহলে আমরা আবার এসে তোমাদের খুন করে যাব।”

অনেক বছর ধরে আফগান নারী ক্রিকেট দলের সঙ্গে জড়িত আছেন তাকওয়া, এটাও ছদ্মনাম। কাবুলের পতনের পর তিনি অবশ্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ধরা পরার ভয়ে একটি সপ্তাহ তিনি বারবার স্থান পরিবর্তন করেছেন।


তাকওয়ার বিষয়ে তথ্য নেওয়ার জন্য তালেবান তার বাবাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। তবে তিনি বলে এসেছেন, তাকওয়ার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।

সে সময়ের কথা মনে করে তিনি বলেন, “কী হতে পারত সেটা আমি ভাবতেও চাই না। তালেবান যখন কাবুলে আসে, আমি এক সপ্তাহ কিছু খেতে পারিনি, ঘুমাতেও পারিনি।

“আমি কেবল নিজের কথাই ভাবিনি, আমি আমার দলের মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। তারা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে খেলার জন্য। লেখাপড়া ছেড়েছে, এমনকি কয়েকজন বিয়ে পর্যন্ত করেনি, যাতে তারা আফগানিস্তানের হয়ে খেলতে পারে। আমি তাদের নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।”

সাবেক খেলোয়াড় হারীর বিবিসির সঙ্গে ছদ্মনামেই কথা বলেছেন। তিনি জানান, একজন আফগান নারী হিসেবে ক্রিকেট খেলা তাদের কাছে উইকেট আর রানের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। 

“আমি যখন খেলি নিজেকে আমার অনেক শক্তপোক্ত নারী মনে হয়। আমি তখন অনেক আত্মবিশ্বাসী থাকি, নিজের জন্য গর্ব বোধ করি।


“আমি নিজেকে এমন একজন নারী হিসেবে কল্পনা করতে পারি, যার যে কোনো কিছু করার সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজের স্বপ্নকে সে বাস্তবে পরিণত করতে পারে।”

কিন্তু হারীর এবং আফগানিস্তান নারী ক্রিকেট দলের বাকি সদস্যদের সেই স্বপ্ন হয়ত শেষ হতে যাচ্ছে।

এক বছর আগেও যাদের অনেক স্বপ্ন ছিল, এখন তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত। তারা মনে করছেন, যে ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ তাদের সহায়তা করতে পারত, তারাও এখন আর তাদের কথা ভাবছে না। 


আফগানিস্তানে ক্রিকেটের উত্থান অনেকটা কল্পকাহিনীর মত। খেলাধুলার উপর থেকে তালেবানের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর ২০০১ সালে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সদস্য হয় দেশটি।

তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ফুটবলসহ অন্যান্য খেলার মত ক্রিকেটেও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে শুরু করে আফগানিস্তান।


বিবিসি পশতু বিভাগের সম্পাদক ইমাল পাসারলির ভাষায়, “আমরা যদি গত ২০ বছরের দিকে ফিরে দেখি, আমাদের রয়েছে যুদ্ধ, আত্মঘাতী হামলা, আমাদের অনেক সমস্যাই রয়েছে, কিন্তু একমাত্র খেলা হলেই পুরো জাতি আনন্দে মেতে উঠত, এর সঙ্গে তাদের আবেগ জড়িত।


“খেলাই একমাত্র মানুষকে আনন্দের সময় কিংবা স্থান দিতে পেরেছে, যেখানে তারা নিজেদের আশপাশে যা কিছু ঘটছিল, সেসব ভুলে থাকতে পারত।”

আফগান পুরুষ ক্রিকেট দলের বিশ্বের দরবারে উঠে আসার মধ্য দিয়ে ২০০০ সালের পর থেকে আফগানিস্তানে ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনা শুরু হয়।

২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপের জন্য যোগ্য নির্বাচিত হওয়ার পর সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে তা উদযাপন করে। এপর ২০১৭ সালে টেস্ট মর্যাদাও পেয়ে যায় দেশটি।

আফগান ক্রিকেটার রশিদ খান এবং মোহাম্মদ নবী এখন আন্তর্জাতিক তারকা, দেশেও তাদের অনেক কদর।

আফগানিস্তানের প্রথম জাতীয় নারী দল গঠন হয় ২০১০ সালে। তবে শুরু থেকেই তারা বাধার মুখে পড়ে। তালেবানের হুমকির কথা উল্লেখ করে প্রথম কয়েক বছর নারী দলকে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে দেয়নি আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি)।

২০১২ সালে তাজিকিস্তানে ছয় সদস্যের ক্রিকেট দলের একটি আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে জয় পায় আফগান নারীরা। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে তারা গুটিয়ে যায়। আবারও তালেবানের হুমকির অজুহাত দেখায় এসিবি।

দল ভেঙে গেলেও এর পর থেকে আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে তরুণী এবং মেয়েরা অস্থায়ী উইকেট তৈরি করে খেলতে শুরু করে। নারীদের জন্য এ সময় খুব কমই খেলার আয়োজন করেছে এসিবি।

কিন্তু নতুন প্রজন্মের নারী ক্রিকেটারদের জন্য সেই একই সমস্যা রয়ে যায়।

হারীর বলেন, এসিবির অনেকেই নারীদের সমর্থন দিতেন না এবং ‘আবেদন নিবেদন করলেই’ কেবল নারীদের জন্য ম্যাচ আয়োজন করা হত। পিচে থাকার সময় নারীদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়েও শেখাতেন বোর্ড সদস্যরা।

“আমি একজন বোলার এবং যখন কোনো উইকেট নিতাম তখন চিৎকার কিংবা আনন্দ প্রকাশ করতে পারতাম না, কেননা পুরুষরা আমাকে দেখছে! 


“আমাকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হত, আমি দলের বাকি সদস্যদের সমর্থন দিয়ে চিৎকার করতে পারতাম না, আমি সমর্থন জানাতে পারতাম না। তারা বলত: তোমার আনন্দ করা উচিত না, তোমার চিৎকার কিংবা অঙ্গভঙ্গি করা উচিত না।’”

কিন্তু পুরুষ দলের সুনাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসিবিকে নারীদের খেলার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হল। আইসিসির ১২টি দল দরকার ছিল। সেই সুযোগে আফগানিস্তানের জাতীয় নারী ক্রিকেট দলও আইসিসির তালিকায় চলে আসে ২০১৭ সালে। এরপর ২০২০ সালের নভেম্বরে ২৫ জন নারী ক্রিকেটার জাতীয় দলে চুক্তিবদ্ধ হন।

মাত্র ১০ মাস আগেই আফগান নারী ক্রিকেটের দিগন্তরেখায় নতুন সূর্যের উদয় হয়েছিল। কিন্তু সে আশার আলো খুব কম সময়ের মধ্যেই নিভে গেল।


এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শাসন ক্ষমতায় থাকার সময় মেয়েদের প্রায় সব ধরনের শিক্ষা নিষিদ্ধ করে তালেবান (৮ বছর পেরিয়ে গেলে মেয়েরা আরা স্কুলে যাওয়ার অনুমোদন পেত না)। নারীরা বাইরে কোনো কাজ করতে পারতেন না, পুরুষ আত্মীয়র সঙ্গে ছাড়া বাড়ির বাইরেও যেতে পারতেন না।

এবার তালেবানের পক্ষ থেকে আগের চেয়ে ‘নমনীয়’ ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করা হলেও নারীদের খেলাধুলার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

এসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদ শিনওয়ারি জানিয়েছেন, পুরুষ ক্রিকেট দলের প্রতি সমর্থন দিয়েছে তালেবান। আগামী নভেম্বরে অস্ট্র্রেলিয়ার হোবার্টে তাদের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বিবিসিকে তিনি বলেছেন, তিনি মনে করছেন নারী ক্রিকেট হয়ত বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেটা হলে আইসিসির সদস্য পদের নিয়ম লঙ্ঘন হবে।

গত অগাস্টে অস্ট্রেলিয়া সরকার যেভাবে আফগানিস্তানের ৫০ জন নারী অ্যাথলেটকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে, দেশটির নারী ক্রিকেটাররাও তেমনটাই আশা করছেন।

বিশ্ব ফুটবলের পরিচালনা পর্ষদ ফিফা জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে ফুটবলার এবং অন্যান্য অ্যাথলেটদের সরিয়ে নেওয়ার ‘জটিল প্রক্রিয়া’ নিয়ে তারা আলোচনা করছে।

আসিসির একজন নারী মুখপাত্র বলেন, “আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আমরা নিবিড় যোগাযোগ রাখছি এবং পরিস্থিতি নজরে রাখছি, আমাদের সমর্থন জানিয়েছি।”

কিন্তু তাকওয়া বলেন, দেশের নারী ক্রিকেটারদের সঙ্গে আইসিসির সরাসরি যোগাযোগ নেই এবং তাদের ভালোর জন্য ‘খুব সামান্যই’ আগ্রহ দেখিয়েছে এসিবি।

তালেবানের নিয়োগ দেওয়া এসিবির নতুন চেয়ারম্যান আজিজুল্লাহ ফজলির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আইসিসি কখনোই আমাদের সহায়তা করেনি, তারা সবসময় আমাদের হতাশ করেছে। এসিবির নতুন চেয়ারম্যানের মতে যারা নারী ক্রিকেটের বিরুদ্ধে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করছে আইসিসি।”


এসিবি নারী ক্রিকেটকে এখনও সমর্থন করে কি না জানতে চাইলে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদ শিনওয়ারি বলেন, “ভবিষ্যতের সরকার সে সিদ্ধান্ত নেবে।”

এমন সঙ্কটের মধ্যেও বিশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন আফগান নারী ক্রিকেটাররা। এসেল এখনও আশা করেন, তাদের পুরো দল আবারও এক হতে পারবে। আরও ভালো একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলার সময় হারীর যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পান। 

তিনি বলেন, “আমি একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলোয়াড় হয়ে উঠতে চাই।… আমি দৃঢ় একজন আফগান নারী হয়ে উঠতে চাই যে অন্য মানুষের জীবনও বদলে দিতে পারে।

“আমি আফগান নারী এবং মেয়েদের সামনে উদাহরণ হয়ে উঠতে চাই। আফগানিস্তানের অন্তত কিছু পুরুষের চিন্তায় আমি পরিবর্তন আনতে চাই। আমি নিজের জন্য গর্বিত হতে চাই এবং সেটাই যথেষ্ট।”

হারীর বলেন, “আফগান সংস্কৃতিতে অনেকগুলো বাধা আছে যা নারীদের খেলাধুলার ওপর প্রভাব ফেলে। তারা বলে নারীরা দুর্বল এবং তাদের ক্রিকেট খেলার জন্য তৈরি করা হয়নি। তারা বিয়ে করবে, সন্তান জন্ম দেবে এবং ঘরের কাজ করবে আর সন্তানের লালন পালন করবে। তাদের উচিত স্বামীর সেবাযত্ন করা।

“আমার পরিবারেও কিছু আত্মীয়-স্বজন আছেন যারা বলেন, আমি খেলাধুলা করতে পারব না, কারণ ইসলামিক সংস্কৃতি একজন নারীকে ক্রিকেট খেলতে দেবে না। কিন্তু আমি খেলতে ভালবাসি।

“পরিস্থিতি আমাদের জন্য খারাপ। কিন্তু যতখন শ্বাস ততক্ষণই আশ। আমাদের যদি দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অন্য যে কোনো স্থানেই নেওয়া হোক, আমরা আবারও শুরু করব।

“আমাদের স্বপ্ন থেকে আমরা সরব না, ইনশাল্লাহ।”

মন্তব্য

আরও দেখুন

জামালপুর লাইভ টিভি